মঙ্গল অভিযান থেকে ভবিষ্যৎ বসতি | Mind Of Salman
মঙ্গল গ্রহ: লাল গ্রহের রহস্যে ঘেরা হাতছানি!
রাতের আকাশে ওই যে লালচে বিন্দুর মতো জ্বলজ্বল করে, ওটাই মঙ্গল গ্রহ! আমাদের সৌরজগতের চতুর্থ গ্রহ, যা কিনা রহস্য আর সম্ভাবনায় মোড়া। ছোটবেলা থেকে কতো গল্প, কতো সিনেমাতেই না মঙ্গলের কথা শুনেছি আমরা। কিন্তু আসলেই কেমন এই গ্রহটা? কেন একে 'লাল গ্রহ' বলা হয়? এখানে কি সত্যিই প্রাণের অস্তিত্ব ছিল বা আছে? মানুষ কি কখনো মঙ্গলে বসতি গড়তে পারবে? – এই সব প্রশ্ন যুগ যুগ ধরে মানুষকে ভাবিয়েছে। চলুন, আজ আমরা এই লাল গ্রহের রহস্যময় জগতে একটু ঢুঁ মেরে আসি।
কেন এই গ্রহ এত লাল?
মঙ্গলের সবচেয়ে পরিচিতি তার লালচে রঙের জন্য। এর কারণ হলো মঙ্গলের মাটি আর পাথরে প্রচুর পরিমাণে আয়রন অক্সাইড বা সোজা বাংলায় বললে মরিচা আছে। ধুলো ঝড়ের সময় এই লালচে মরিচার কণা পুরো বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, আর তাই দূর থেকে গ্রহটাকে লাল দেখায়। ভাবুন তো, পুরো একটা গ্রহ যেন মরিচায় ঢাকা!
মঙ্গল কি পৃথিবীর যমজ ভাই? না ঠিক তা নয়!
প্রায়ই মঙ্গলকে পৃথিবীর সাথে তুলনা করা হয়। কারণ এখানেও পৃথিবীর মতো পাহাড়, উপত্যকা, সমভূমি, এমনকি মেরু অঞ্চলে বরফের চাঁইও আছে। মঙ্গলেও ঋতু পরিবর্তন হয়, যদিও তা পৃথিবীর চেয়ে অনেক দীর্ঘ। কিন্তু মিলের চেয়ে অমিলও কম নয়। মঙ্গল পৃথিবীর চেয়ে বেশ ছোট। এর বায়ুমণ্ডল খুবই পাতলা, মূলত কার্বন ডাই অক্সাইডে পূর্ণ, যা আমাদের শ্বাস নেওয়ার জন্য একদমই উপযুক্ত নয়। আর এখানকার তাপমাত্রা? বেশিরভাগ সময়ই হিমাঙ্কের অনেক নিচে থাকে। দিনের বেলা কিছুটা উষ্ণতা থাকলেও রাতগুলো ভয়ঙ্কর ঠান্ডা!
অতীতের জলধারা আর প্রাণের খোঁজ
মঙ্গলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর একটা হলো এর জল। বিজ্ঞানীরা প্রায় নিশ্চিত যে, কোটি কোটি বছর আগে মঙ্গলের বুকে তরল জলের নদী, হ্রদ এমনকি সাগরও ছিল! বিভিন্ন মহাকাশযান থেকে পাঠানো ছবিতে শুকিয়ে যাওয়া নদীখাত, বদ্বীপের মতো ভূমিরূপ দেখা গেছে। এখন যদিও পৃষ্ঠে তরল জল নেই, মেরু অঞ্চলে আর মাটির নিচে বরফ হিসেবে জলের বিশাল ভান্ডার রয়েছে।
আর যেখানে জল, সেখানেই তো প্রাণের সম্ভাবনা উঁকি দেয়, তাই না? এই কারণেই বিজ্ঞানীরা মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজছেন। অবশ্য এই প্রাণ বলতে আমরা সবুজ রঙের এলিয়েন বোঝাচ্ছি না, বরং অতীতে বা বর্তমানে টিকে থাকা অণুজীবের (Microbes) মতো সরল প্রাণের চিহ্ন খোঁজা হচ্ছে। নাসার পারসিভেরান্স (Perseverance) রোভারের মতো যানগুলো মঙ্গলের মাটি ও পাথর খুঁড়ে সেইসব চিহ্নই খুঁজছে। যদিও এখনও নিশ্চিত কোনো প্রমাণ মেলেনি, কিন্তু অনুসন্ধান চলছে পুরোদমে।
মঙ্গলের বাসিন্দা: আমাদের রোবোটিক দূতেরা
মানুষ সরাসরি মঙ্গলে পা না রাখলেও, আমাদের রোবোটিক দূতেরা কিন্তু সেখানে দারুণ কাজ করছে! স্পিরিট, অপরচুনিটি, কিউরিওসিটি, পারসিভেরান্সের মতো রোভারগুলো মঙ্গলের বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ছবি পাঠাচ্ছে, পাথর বিশ্লেষণ করছে। অরবিটারগুলো মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করে আবহাওয়া, পরিবেশ আর ভূতত্ত্ব নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। এই যন্ত্রগুলোই মঙ্গলে আমাদের চোখ আর কান।
ভবিষ্যতে মানুষ কি মঙ্গলে যাবে?
শুধু রোবট পাঠিয়েই মানুষ সন্তুষ্ট নয়, আমাদের লক্ষ্য আরও অনেক বড় – মঙ্গলে মানুষের বসতি স্থাপন! এটা শুনতে হয়তো এখনও সায়েন্স ফিকশনের মতো লাগে, কিন্তু নাসা, স্পেসএক্স (SpaceX) এর মতো সংস্থাগুলো এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজ করে চলেছে। অবশ্য এর জন্য অনেক চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যেমন – দীর্ঘ মহাকাশযাত্রা, ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে সুরক্ষা, পাতলা বায়ুমণ্ডলে টিকে থাকা, প্রয়োজনীয় রসদ (অক্সিজেন, জল, খাবার) তৈরি করা ইত্যাদি। কিন্তু মানুষের অদম্য ইচ্ছা আর প্রযুক্তি হয়তো একদিন এই বাধাও অতিক্রম করবে। ভাবুন তো, একদিন হয়তো মঙ্গলের লাল মাটিতে মানুষের পায়ের ছাপ পড়বে!
শেষ কথা
মঙ্গল গ্রহ একই সাথে আমাদের কাছে পরিচিত আবার অসীম রহস্যে ঢাকা। লাল ধুলোর চাদরে মোড়া এই গ্রহ আমাদের জানার আগ্রহকে প্রতিনিয়ত উসকে দেয়। রোবোটিক অভিযানগুলো থেকে পাওয়া নতুন নতুন তথ্য আমাদের ধারণাকে প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে। মঙ্গলে কি সত্যিই প্রাণের অস্তিত্ব ছিল? মানুষ কি পারবে সেখানে টিকে থাকতে? – এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার যাত্রাই তো আসল রোমাঞ্চ। লাল গ্রহের এই হাতছানি উপেক্ষা করা সত্যিই কঠিন!
আশা করি মঙ্গল গ্রহ নিয়ে এই ছোট্ট ব্লগ পোস্টটি আপনাদের ভালো লেগেছে! আপনার কী মনে হয়, মঙ্গলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক কোনটি? কমেন্টে জানাতে পারেন!
মঙ্গল গ্রহ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে
মঙ্গল গ্রহ - উইকিপিডিয়া
মঙ্গল গ্রহ - নাসা
